কবর পাকা করা, কবরের ওপর ফুলের মালা দিয়ে সাজানো বা ফুল ছিটানো বা আতরগোলাপ দিয়ে কবরকে সুগন্ধ করা প্রমাণ করে না যে এই কবরে শায়িত ব্যক্তি বুজুর্গ বা নেককার বা জান্নাতি। এই পাকা কবর শায়িত ব্যক্তির জন্য কোনো বেনিফিটও দেবে না। তবে তার উত্তরসূরি যারা আছেন, তাদের মনে ণিকের জন্য তৃপ্তি দিতে পারে। কারণ আমাদের দেশে এক শ্রেণীর লোক আছেন, বিশেষ করে যাদের আমরা এলিট কাবের লোক বলে মনে করি, তারা তাদের পরিবারের মৃত ব্যক্তিকে তাদের শ্রেণী মাযাদায় দাফন করতে পেরেছেন এটাই তাদের সান্ত্বনা। ঢাকার গুলশান, বনানী, বারিধারার কবরস্থানগুলোর দিকে তাকালে তেমনি কিছু মনে হয়।

আসলে এসব কিছুই করা হয় মাটির উপরে যারা আছেন তাদের সন্তুষ্টির জন্য। তারা এটাকে নিজেদের উচ্চ সমাজের কালচারও মনে করে থাকেন। তাই তারা সেটা করেন। কিন্তু এটা যে কত বড় ভুল সেটা তাদের বলাও মুশকিল বুঝানোও মুশকিল। এখন এই ভুলটা তারা কেন করছেন? এজন্য করছেন, আখেরাত বা পরকাল যে কি জিনিস, সেটা তারা অনুধাবন করতে পারেন না। তারা মনে করেন, তাদের জীবনটা এখানেই, এই দাফন কাফনেই শেষ। তারপরে যদি কিছু থাকে তাহলে সেটা হুজুর বা মাওলানা সাহেবদের ওয়াজমাত্র। অথচ মৃত্যুর পরেও যে একটা জীবন আছে, তাও আবার অনেক লম্বা জীবন, যেখানে অনেক দিন থাকতে হবে, প্রশ্নোত্তর হবে, সমস্যা আছে, সুখশান্তির প্রশ্ন আছে । এ কথাগুলোর ওপর তাদের ঈমান বা বিশ্বাস নেই । আর থাকলেও সেটা তারা বোঝেন না। কারণ তারা লেখাপড়া তো অনেক করেছেন, কিন্তু সে লেখাপড়া করেন নিয়াতে মত্যুর পড়ের জীবনের অবস্থা জানা যাবে।

এই দুনিয়াতে কী করলে আখেরাতে শান্তি পাওয়া যাবে আর কী না করলে সেখানে অশান্তি হবে, সে বিষয়গুলো তারা মুসলমান হিসেবে, মুসলমান সমাজে বসবাস করতে গিয়ে এবং বিভিন্ন আলোচনা শুনে আখেরাত সম্বন্ধে কিছু জ্ঞান হয়তো অর্জন করতে পেরেছেন । কিন্তু শক্তভাবে আখেরাতের ওপর বিশ্বাস করতে বা ঈমান আনতে পারছেন না। কারণ তারা সেখানের অবস্থাটা দেখেন না, কবরবাসীর সাথে তাদের কোনো যোগাযোগ নেই এবং সমাজে সেটার উদাহরণও নেই। তাই আখেরাত বা পরকাল কী, তা তাদের বুঝে আসে না।

আখেরাত বা পরকাল কী, সেটা বুঝে না আসার কারণ অন্য কিছু নয়, ঈমানের অনুপস্থিতি বা দুর্বলতা মাত্র। একজন মানুষ সে নিজেকে মুসলমান বলে দাবি করে, মুসলমান ঘরের সন্তানও বটে। কিন্তু মুসলমান হওয়ার পর তার মুসলমানিত্ব ধরে রাখার জন্য ইসলামি শরিয়ত তাকে যে নিয়মনীতি আদেশ-নিষেধ পালন করার উপদেশ দেয়, সেটা সে যথাযথভাবে পালন করে না। নাস্তিক হিসেবে নিজেকে পরিচয় দিতেও গর্ববোধ করে। কারণ সে আল্লাহকে, আল্লাহর একাত্ববাদকে, আল্লাহর রমতকে, আল্লাহর শক্তিকে এবং আল্লাহর আইন আদালত আখেরাতকে বিশ্বাস করে না। এমনকি অনেক সময় ইসলামি শরিয়তের বিরুদ্ধে দাম্ভিকতার সাথে কথাও বলে। অর্থাৎ এক কথায় যাকে বলে আল্লাহ এবং তার গুণবাচক নামগুলোর গুরুত্বকে বা অস্তিত্বকে অস্বীকার করা। সে জন্যই তাকে নাস্তিক বলা হয়।

কিন্তু সে যখন মারা যায় তখন তার দাফন কাফন আতরগোলাপ জানাজা কবরে নামানোর পদ্ধতি কিবলার দিকে মুখ রেখে কবরস্থ করা দোয়া দুরুদ পড়া এবং শেষ পর্যন্ত কবরটিকে পাকা করা- এসব কিন্তু ঠিক আছে। এগুলো কেন করা হয়? যাতে করে সে কবরে সুখে-শান্তিতে আরামে থাকতে পারে। এখানে কথা প্রসঙ্গে নাস্তিকদের প্রসঙ্গ এসে গেল তাই কথাটা পরিষ্কার করে দিলাম। তবে এটাও ঠিক, সব পাকা কবরবাসীই নাস্তিক নয়।

ঈমান-একিন বা বিশ্বাস শব্দটি যেহেতু ইসলামি শরিয়তের সাথে সংশ্লিষ্ট একটি শব্দ, তাই এর সম্বন্ধে আলোচনা করতে হলে আমাদের ইসলামি শরিয়তের ওপর ভিত্তি করেই আলোচনা করা দরকার।

ঈমানের মূল ডেফিনিশন হলো শাহাদাহ অর্থাৎ আমি যে ঈমান আনলাম বা বিশ্বাস করলাম তা সা্েযর মাধ্যমে প্রকাশ করা বা স্যা দেয়া। সেটা কিভাবে- কালিমা তায়্যিবাহ ও কালিমা শাহাদাহ শুদ্ধ করে মুখে পড়তে হবে, অন্তর দিয়ে বিশ্বাস করতে হবে এবং শরীরের প্রত্যেকটি অঙ্গের মাধ্যমে তা বাস্তবায়ন করে দেখাতে হবে। আমরা এখানে ঈমানের মূল ফর্মুলাটা যা পেলাম তা হলো- কথা+নিয়ত+কাজ= ঈমানদার বা মোমিন। অর্থাৎ একজন মুমিনের জিহ্বা, অন্তর ও কাজের মধ্যে অবশ্যই মিল বা সমন্বয় থাকতে হবে। ব্যতিক্রম হলেই নিফাক বা মুনাফিকের সংজ্ঞায় পড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা আছে।

এখন এই ঈমানের পুরো ব্যাখ্যায় আসা যাক, যা বিশুদ্ধতম হাদিসের কিতাব বোখারি শরিফে এসেছে। হাদিসটি ‘হাদিসে জিবরাইল’ নামেও প্রসিদ্ধ। একদিন ফেরেশতা জিবরাইল আ: হুজুর সা:-এর একেবারে কাছে এসে সামনাসামনি বসে প্রশ্নের মাধ্যমে জানতে চাইলেন ‘ইসলাম কী? হুজুর সা: যথাযথ উত্তর দিলেন। ফেরেশতা বললেন যে, আপনি ঠিকই বলেছেন। তারপর ফেরেশতা জিজ্ঞাসা করলেন ঈমান কী? হুজুর সা: যে উত্তর দিলেন তার অর্থ হলো, ‘আল্লাহর ওপর (বিশ্বাস করা এবং ভরসা রাখা ) ঈমান আনা, তার ফেরেশতাদের ওপর, তার কিতাব সমূহের ওপর, তার নবী ও রাসূলগণের ওপর, আখেরাতের ওপর (কবরের জীবন এবং প্রশ্নোত্তর), মৃত্যুর পর পুনরুত্থানের ওপর (যার মধ্যে রয়েছে হিসাব, মিজান, সিরাত, ফায়সালা, জান্নাত বা জাহান্নাম) ঈমান আনা এবং তাকদিরের ভালোমন্দের ফায়সালা আল্লাহর প থেকে এবং তিনি অবগত আছেন বলে ঈমান রাখা। এই হাদিসে আরো আলোচনা আছে কিন্তু আজকের প্রসঙ্গের সাথে সংশ্লিষ্ট নয়।

এখানে ঈমানের যে সাতটি অংশ আমরা পেলাম, তার মধ্যে আখেরাত বা পরকালের ওপর অর্থাৎ কবরের জীবনের ওপর ঈমান আনা বা বিশ্বাস করার কথাও বলা হয়েছে। এখানে উল্লেখ্য, ঈমানের সাতটি অংশের ওপর একত্রে বিশ্বাস করার নামই হলো ঈমান। এই বিশ্বাসটা যার যত দৃঢ় হবে, শক্ত হবে, মজবুত হবে তার দুনিয়াবি আমল বা কাজ তত পরিচ্ছন্ন হবে, পবিত্র হবে। কারণ সে ঈমানের মাধ্যমে বুঝে নিয়েছে যে, মিথ্যা কথা বললে, অবৈধ উপায়ে মাল কামালে, নামাজ ছেড়ে দিলে, কারো ওপর জুলুম করলে, মা-বাবাকে কষ্ট দিলে সামনে কবরে খবর আছে, আজাব পেতে হবে, মার খেতে হবে। কিন্তু মজবুত ঈমান না থাকার ফলে, অর্থাৎ কবরে যে আজাব হবে এর ওপর শক্ত বিশ্বাস না থাকার ফলে অনেকেই নামাজ পড়েন আবার হারামও খান । হজ করেন আবার বাটপারিও করেন।

অনেকের ঈমান আছে বটে কিন্তু দৃঢ়তার সাথে বিশ্বাস করতে পারছেন না যে কবরের সুখশান্তি নির্ভর করছে তাদের দুনিয়াবি কাজের ওপর। কবরের জীবনকে তারা যে বিশ্বাস করছেন না তার প্রমাণ হলো তাদের দুনিয়াবি জীবন। কবরের জীবনকে ভুলে গিয়ে দুনিয়াকে সাজালেন। কিন্তু যখন তাদের হাত পা তাদের আর বিশ্বাস করে না, জওয়াব দিয়ে দেয়, কাপতে থাকে, মালাকুল মাউতও এসে যায়, পেছনের সারা জীবনের বাটপারি আর কৃতকাজ একসাথে সামনে এসে পাহাড়ের মতো দেখা দেয়, তখন তারা কবরকে ভয় পায়, সুরমা আতর লাগায় এবং কবরের ওপরের দিকটা ডেকোরেশন করে, সাজাতে চেষ্টা করে।

ষাটের দশকের মিসরের জালেম প্রেসিডেন্ট জামাল আব্দুন নাসেরের সময় আরব বলয়ের মধ্যে কায়রোর আল-আহরাম পত্রিকা ছিল পাহাড়চূড়া উচ্চতায়। তার বিখ্যাত সম্পাদক ছিলেন মুহাম্মাদ হাসান আল-হায়কাল। তিনি আবার প্রেসিডেন্ট নাসেরের ডান হাতের একজন ছিলেন। অর্থাৎ প্রেসিডেন্টের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ ছিলেন। নাসেরের মৃত্যুর সময় মুহাম্মাদ হাসান আল-হায়কালকে প্রেসিডেন্ট ডেকে পাঠালেন। কানের কাছে ডেকে নিয়ে বললেন, ‘হায়কাল আমার জীবন হয়তো শেষ হয়ে গেল, আমি হয়তো চলে যাচ্ছি। তবে আমাকে একটা কথা বলো তো, ‘আখেরাত বলতে আসলেই কিছু আছে কি, যেখানে দুনিয়ার কৃতকমের জন্য জওয়াব দিতে হবে? অর্থাৎ মৃত্যুর পর কোনো জীবন আছে কি?

মুহাম্মাদ হাসান আল-হায়কাল কয়েক সেকেন্ড চুপ থেকে চিন্তা করছিলেন কী জওয়াব দেয়া যায়। দেখলেন প্রেসিডেন্ট ঘেমে গেছেন। বললেন, ‘দোস্ত যদি আখেরাত না-ই থাকে তাহলে তুমি যাচ্ছ কোথায়? তোমার মৃত্যুইবা হবে কেন?’ সুতরাং মৃত্যু যখন এসে গেছে সত্য, তা হলে তোমার এই মৃত্যুই প্রমাণ করে যে আখেরাত বা পরকাল আছে। ‘ইন্নাল্লাহ হাক্ক, ওয়া ওয়া’দুহু হাক্ক, ওয়া কালামুহু হাক্ক, ওয়া রাসুলুহু হাক্ক’। আল্লাহ সত্য, তাঁর ওয়াদা সত্য, তাঁর কুরআন সত্য, তাঁর রাসূল সত্য। কিন্তু দুর্ভাগ্য আমাদের, আমরা আরেকজনের কবর তো পাকা করতে শিখলাম কিন্তু আমাদের জীবদ্দশায় আমাদের নিজেদের কবরকে বা আখেরাতকে বিশ্বাস করলাম না, চিনলাম না। সূএঃ নঃ দিগন্ত