এই শহর (2)

“এই শহর”

কাঁধেতে ঝুলিয়ে ব্যাগ,যে যার প্রয়োজনে দিবা-নীশি ছুটে চলেছে ঢাকার রাজপথে । কেউ কারো দিকে একপলক ফিরে তাকাবার সময় নাই । এই শহরে অন্ন, বস্ত্রের পাশা-পাশি ফুটপাতে হাঁটার জন্যও সংগ্রাম করতে হয় । একটু দূর্বল হলে আপনাকে কেউ একজন পিছনে ফেলে সামনে যাবে। অন্য শহরে মানুষ বাসস্টপে বসে থাকে ফাঁকা সিটে বসার জন্য ।

আর এই শহরে নর-নারী দৌঁড়ে বাসে ওঠে এক পাশে দাঁড়িয়ে বা ঝুলে যাওয়ার জন্য। এ শহরে জীবনের থেকে সময়ের মূল্য অনেক বেশি। এখানে টাকা থাকলে সব কিছু পাওয়া যায়। “টাকা না থাকলে ঘুমানোর জন্য ফুটপাটও মিলে না”

এই শহরে মধ্য-রাতে ভালোবাসা কেনা-বেচা চলে ভালো দামে । এই শহরের দেওয়ালে প্রতিদিন হাজারো ও পোস্টার লাগানো হয়। প্রতিটা পোস্টারের পিছনে এক একটা বেকারের ক্ষুদার্থ পেটের হাহাকার থাকে। কে বা রাখে সেই খবর। “এ শহরে পোস্টারে উপরে পোস্টার লাগানো নিষিদ্ধ হোক। কারণ প্রতিটা পোস্টারের পিছনে হাজারো অশ্রুভরা নয়নের আশার আলো থাকে”।

এই কংক্রিটের শহরে বাস করতে করতে সবার মনে দারুণ ময়লা জমেছে যা ইট, পাথরে রুপ নিচ্ছে । কাপড়ের ময়লা পরিষ্কারের জন্য বাজারে ভালো ডিটারজেন্ট আছে। কিন্তু মনের ময়লা পরিষ্কারের জন্য এখনো কোনো ডিটারজেন্ট আবিষ্কার হয়নি। যদি কোনো ডিটারজেন্ট কোম্পানী তা আবিষ্কার করে তবে তারা ভালো সু-ফল পাবে। প্যাকেটের গায়ে লেখা থাকবে ব্যবহারের সাথে সাথে রেজাল্ট।

এখানে শীতের রাতে অনেকেই বস্ত্রহীন গাঁয়ে রাত পাড় করে । মধ্য রাতে যখন কালো মেঘে আকাশ অন্ধকারে ছেঁয়ে যায় এ বস্ত্রহীন মানুষগুলো দিশেহারা হয়। তখন কেউ তাদের খবর রাখে না। এই শহরেই পাঁচ বছরের বাচ্চা সুন্দর পোশাক পড়ে ইংলিশ মেডিয়াম স্কুলে যায়। আবার এ শহরেই পাঁচ বছরের ছোট মেয়ে দু-মুঠো অন্নের আশায় ফুটপাতে ফুল বিক্রি করে।

কেউ বা আবার ময়লার গাড়ি ঠেলে। সত্যি এ শহরটা চমৎকার। ফ্লাইওভার ব্রিজের নিচে বসে ষাট বছরের প্রবীণ মানুষটা কাকতাড়ুয়ার মতো চেয়ে থাকে দুইটা টাকার জন্য। হয়তো অসুস্থ কাতর বৃদ্ধ স্ত্রীটা বেড়ার ঘরে তার অপেক্ষায় প্রহর গুনছে। কে বা তাদের আদমশুমারী করে। এই শহরে গরিবদের নিয়ে সবাই ভাবে । সত্য কথা বলতে, যারা ভাবে তারা কেউ সাহায্য করে না।এখানে বিভিন্ন দিবসে অনেক বড় বড় অনুষ্ঠানের আয়োজন হয়। সেখানে চমৎকার ধরনের লাল, নীল, হলুদ ইত্যাদি রঙ এর আলোক সজ্জার ব্যবস্থা করা হয়।

সেই মুক্ত মঞ্চে দাঁড়িয়ে মাননীয় প্রধান অতিথী মহোদয় নানান ধরনের কথার ফুলঝুড়ি পরিবেশন করেন। তাদের কথা বলার ধরণ সাধারণ মানুষের মতো নয় । তারা উচ্চ স্বরে টেনে টেনে কথা বলেন, যাতে করে তাদের কথা সবার মনে ঝড় তুলে । তাদের মধ্য অনেকেই অন্ন, বস্ত্র বাসস্থান নিশ্চিতের কথা বলেন। কেউ কেউ আবার ধর্ষণেরর বিরুদ্ধেও রুখে দাঁড়ানোর কথাও বলেন ।

এ অনুষ্ঠানের আলো নিভে যাওয়ার সাথে সাথে তাদের কথামালার চক্রের সমাপ্তি হয় । এ শহরে অন্নহীন মানুষগুলোই বস্তার ঘরে, এক গ্লাস পানি খেয়ে বড় শান্তিতে ঘুমায় । তাদের এ শান্তির ঘুমের রহস্য তাদেরকে দেশটা লুট করার জন্য সারা নিশী চিন্তায় মগ্ন থাকতে হয়না । যারা ঐ দামি অট্টলিকায় ঘুমায় এই বিশেষ চিন্তা করতে গিয়ে আর ঘুমানো হয়ে ওঠেনা ।” যার যত টাকা তার তো মাথা ব্যথা”। এ শহরে নিম্নবিত্ত আয়ের মানুষের রোজগারের ভালো পথ বাস, ট্রাক,লেগুনার হেলপারি করা।

এ শহরে কোট-টাই ওয়ালা মানুষের থেকে অশিক্ষিত মানুষের সংখ্যা বেশি। কোট-টাই ওয়ালা ভাইদের ব্যবহার বড় চমৎকার ধরনের । মাঝে মাঝে তারা বিশ টাকার ভাড়া দশ টাকা দেন । তা নিয়ে বাস হেলপারদের সাথে দারুণ ঝগড়া বাঁধে । হেলপার অশিক্ষিত মানুষ গুছিয়ে কথা বলতে পারে না । তাই তারা ঝগড়া যুদ্ধে হেরে যায় । বিনিময়ে তাদের গালে ফ্রিতে কিছু চর, থাপ্পর পরে । সত্যিই এই শহরটা বড় কেমন যেন। নির্দোষীদের থেকে অন্যায় কারীরা বড় শান্তিতে থাকে।

এই শহরের শিক্ষিত ভদ্র- মহোদয় গন, রিক্সাওয়ালাকে ডাকে: এই রিক্সা। বাদামওয়ালাকে ডাকে : এই বাদাম। ঝালমুড়িওয়ালাকে ডাকে : এই ঝালমুড়ি। আর তাদের লক্ষ টাকা দিয়ে কেনা কুকুর কে ভুল করেও কুকুর নামে ডাকেনা। তাদের কে ডাকে টোমি সোনা, জেরি সোনা, ইত্যাদি রম্য সব নামে। “এ শহরে অনেকেই তাদের লক্ষ টাকায় কেনা কুকুর, বিড়ালের বিরাট আয়োজন করে জন্মদিন পালন করে । “আর ফুটপাতে শুধু সামান্য সাদা ভাতের জন্য লক্ষ মানুষ ঘন্টার পর ঘন্টা অপেক্ষা করে। সত্যি এ শহরটা বড় চমৎকার।

লেখক: উজ্জ্বল আহমেদ, শিক্ষার্থী ঢাকা কলেজ।