আমে কেমিক্যাল ব্যবহার কি ক্ষতিকর?

আমে কেমিক্যাল কি ক্ষতিকর?
আম: ফাইল ছবি

আম হলো ফলের রাজা। প্রায় সব বয়সী মানুষেরই আম পছন্দ। দেখতে আকর্ষণীয় ও খেতে সুস্বাদু হওয়া এ ছাড়া আমে রয়েছে আমাদের দেহের জন্য প্রয়োজনীয় ভিটামিন ও মিনারেলস। স্বাদে-গন্ধে অতুলনীয় আম সাধারণত উষ্ণ ও অবউষ্ণমণ্ডলীয় অঞ্চলে জন্মে। ইন্দো-বার্মা অঞ্চলে আমের উৎপত্তিস্থল বলে ধারণ করা হয়। তবে বৈচিত্র্যপূর্ণ ব্যবহার ও পুষ্টিমানের কারণে ভারতীয় উপমহাদেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় ফল হলো আম।  বাংলাদেশের প্রায় সব অঞ্চলে আম জন্মে। আম বাণিজ্যিকভাবে চাষ হয়ে থাকে। তাই আমে কেমিক্যাল ব্যবহার নিয়ে লিখেছেন . তাজুল ইসলাম চৌধুরী তুহিন, . মোহাম্মদ আরিফুল ইসলাম আব্দুল কাইয়ুম

মধুমাস খ্যাত জুন-জুলাই মাসে সারাদেশেই কম-বেশি আম পাওয়া যায়। স্বাদে-গুণে ভরা নানা বৈচিত্র্যের আম এখন দেশ পেরিয়ে ইউরোপেও রফতানি হচ্ছে। জুন-জুলাই মাস এলে সারাদেশ যেন আম-কাঁঠালের উৎসবে মেতে ওঠে। আমে ক্ষতিকর বিষের উপস্থিতি আছে কি-না এবং কী মাত্রা আমাদের জন্য ক্ষতিকর, সে বিষয়ে আমাদের ভালোভাবে জানা উচিত।

এ কথা অনস্বীকার্য যে, গত কয়েক বছর যাবৎ আমের উৎপাদন বেড়েছে বহুগুণে। উত্তরাঞ্চল ছাড়িয়ে আম এখন ছড়িয়ে পড়ছে সারাদেশে। আমরা এখন আম উৎপাদনে বিশ্বে ৮ম। এসব ভালো খবর প্রচারের সাথে যোগ হয়েছে অপপ্রচারও। ফল নিয়ে নানা অপপ্রচারের কারণে বিত্তশালী অনেকে আতঙ্কে দেশীয় আম খাওয়া ছেড়ে দিয়েছেন। গবেষণা ছাড়া আম নিয়ে নেতিবাচক অনেক গুজব ছড়ানোর মাধ্যমে দেশীয় ফলের বাজার চলে যাচ্ছে মাফিয়াদের হাতে। এতে উপকৃত হচ্ছে ভারত ও পাকিস্তানের আম ব্যবসায়ীরা। যারা ইউরোপে আম রফতানি করে আয় করছে লাখ লাখ ডলার ইউরো। এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই, ভেজাল বিরোধী নানা অভিযানের ফলে আজ ব্যবসায়ীদের মধ্যে সচেতনতা তৈরি হচ্ছে। অভিযান ও গণমাধ্যমে প্রচারের সুবাদে কুচক্রী ও অসাধু ব্যবসায়ীরা এখন অনেকটাই নিয়ন্ত্রিত। প্রকৃত অপরাধীদের শাস্তির আওতায় এনে এ প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে।

আমের মধ্যে কেমিক্যালের ব্যবহার হচ্ছে- এ কথা ভেবে যদি আমরা আম খাওয়া ছেড়ে দেই, তাহলে আমরা সুলভ ও সহজলভ্য নানা পুষ্টিগুণ থেকে বঞ্চিত হব। আম নানা পুষ্টি উপাদানে ভরপুর। যা শরীর সুস্থ রাখার পাশাপাশি কর্মশক্তি জোগাতেও সহায়তা করে। প্রতি ১০০ গ্রাম আমে ২৭৪০ মাইক্রাে গ্রাম ক্যারােটিন থাকে। এতে ১.৩ গ্রাম আয়রন, ১৪ মিলিগ্রাম ক্যালসিয়াম, ১৬ মিলিগ্রাম ফসফরাস, ১৬ মিলিগ্রাম ভিটামিন সি, ০.৯ মিলিগ্রাম রিভাফ্লভিন এবং ০.০৮ মিলিগ্রাম থায়ামিন থাকে। এ ছাড়াও পাকা আমে রয়েছে জিংকসহ প্রচুর ভিটামিন বি-১ ও বি-২। এসব সহজলভ্য পুষ্টি উপাদান না গ্রহণ করার ফলে নানা রােগ-বালাইয়ের সমস্যা যেমন তৈরি হচ্ছে; তেমনি অপুষ্টিতেও ভুগছে অসংখ্য মানুষ। কেমিক্যাল দিয়ে আম পাকানাে হয়েছে এ অভিযােগে কােন ধরনের পরীক্ষা-নিরীক্ষা ছাড়া হাজার হাজার মন আম ধ্বংস করার আগে কেমিক্যালের ফলে ক্ষতিকর মাত্রা কতটুকু, তা নিয়ে আমাদের আরও বেশি ভাবতে হবে।

এবার আসি বাজারের কিছু চাকচিক্য প্রচারণায়। কেমিক্যাল কিংবা কার্বাইড ও ফরমালিনমুক্ত আম-এখন এক ধরনের প্রচারণা মাত্র। আর এসব প্রচারণা চালিয়ে দুষ্টুচক্রের ব্যবসায়ীরা হাতিয়ে নিচ্ছে বহু টাকা। ইতোমধ্যে ফরমালিন ও কার্বাইডের ব্যবহার আমাদের দেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে নিষিদ্ধ রয়েছে। তবে সীমিত পরিসরে এখনও অনেক ব্যবসায়ী অন্যকােনো নামে এদের ব্যবহার করছে বলে জানা যায়। আর ইথাফন হলো বিশ্বের বহুল ব্যবহত ফল পাকানাের রেজিস্ট্রার্ড কেমিক্যাল। নির্দিষ্ট মাত্রায় ফল পাকানোর কেমিকেল হিসেবেই তা বিশ্বে ব্যবহৃত হয়ে আসছে।

যদিও আমাদের দেশে যেভাবে ইথাফন ব্যবহার করার কথা, তা না মেনে অনেক সময় বেশি ব্যবহার হয়ে থাকে। তবে বাংলাদেশে কার্বাইড নিষিদ্ধের কারণ হলো, এরমধ্যে বিভিন্ন অপদ্রব্যের উপস্থিতি যা স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। এ ছাড়া কার্বাইড ফলের মধ্যে প্রবেশ করে না, কার্বাইড হিট উৎপাদনে ব্যবহৃত হয়, যা আম অথবা অন্য ফলকে পাকাতে সাহায্য করে। অন্যদিকে ইথাফন প্রয়ােগ করা হলেও সেটা কম সময়ের মধ্যেই (২৪ ঘণ্টা) নির্ধারিত মাত্রার নিচে চলে আসে। মজার ব্যাপার হলো, ইথাফন এবং কার্বাইডকে তাৎক্ষণিকভাবে মাপার জন্য কােন যন্ত্র আমাদের দেশে এখনও নেই। আর ইথাফন কিংবা কার্বাইড দিয়ে পাকানাে আমের স্বাদে কিছুটা তারতম্য মনে হলেও এর পুষ্টি উপাদানে খুব বেশি পরিবর্তন হয় না।

আম পাকানাের জন্য ফরমালিন কােনভাবেই দায়ী নয়। প্রাকৃতিকভাবেই আমের মধ্যে ফরমালডিহাইড থাকায় তা আমকে পাকাতে সাহায্য করে। এছাড়া বাহির থেকে ফরমালিন প্রয়ােগ করা হলেও তা আমের ভেতরে প্রবেশ করতে পারে না। এ ছাড়া গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে যে, ফরমালিন ফল ও শাক-সবজিতে কাজ করে না। এটি শুধু আমিষে কাজ করে। তবে ফরমালিন শোধনে চমৎকার ভূমিকা পালন করায় আমের মধ্যে পচনক্রিয়ায় সাহায্যকারী অনুজীবগুলোর উপস্থিতি কমে যাওয়ায় আমের পচনকাল দীর্ঘ হয় বলে অনেক গবেষক মত দিয়েছেন। এ নিয়ে আরও বিস্তর গবেষণা করে তা মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে দিতে হবে।

এ কথা সত্যি যে, আবহাওয়া পরিবর্তনের কারণে নানা রোগ-বালাইয়ের প্রাদুর্ভাব বেড়ে যাওয়ায় বর্তমানে আম বাগানে বালাইনাশকের ব্যবহার বাড়ছে। সঠিক সময়ে রোগ ও পোকামাকড় দমন করতে ব্যর্থ হলে আমের ফলন মারাত্মকভাবে হ্রাস পায়। ছোট আকারের বাগানের ক্ষেত্রে অন্যান্য দমন পদ্ধতি যেমন- আক্রান্ত পাতা বা গাছের অংশ ছিড়ে ফেলা, পোকার ডিম বা কীড়া সংগ্রহ করে ধ্বংস করা, জাল দিয়ে পোকা সংগ্রহ করে নষ্ট করা ইত্যাদি কার্যকর হলেও বড় বাগানে রোগ বা পোকামাকড় দমনের জন্য বালাইনাশক স্প্রে করা ছাড়া আর্থিকভাবে সাশ্রয়ী অন্যকোন উপায় নেই। আমের ফলন নির্ভর করে মূলত আম গাছে মুকুল বা পুষ্পমঞ্জরীর সংখ্যার উপর। তাই আমের মুকুলে রােগ বা পােকার আক্রমণ দেখা দেওয়ার সাথে সাথে জরুরি পদক্ষেপ নিতে নির্দিষ্ট মাত্রার সঠিক বালাইনাশকের ব্যবহার করতে না পারলে তা ক্ষতির কারণ হয়ে উঠতে পারে।

এখন প্রশ্ন হলো, এ বালাইনাশক বা ছত্রাকনাশক আম আমাদের জন্য কতটুকু ক্ষতিকর? গত তিন বছর ধরে আমের মধ্যে বিষক্রিয়ার উপস্থিতি নিয়ে কাজ করছেন কৃষি গবেষণার কীটতত্ত্ব বিভাগের পেস্টিসাইড অ্যানালাইটিক্যাল ল্যাবরেটরির বিজ্ঞানীরা। বালাইনাশকের উপস্থিতির মাত্রা নিয়ে কাজ করা সিনিয়র বিজ্ঞানী ড. দেলোয়ার হোসেন প্রধান জানান, দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে সংগ্রহকৃত আমের এ গবেষণায় মাত্র ৮-১০% আমের মধ্যে বালাইনাশকের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। যার আবার শুধু ৩-৪% Maximum Residue Limit (MRL) অতিক্রম করেছে। অর্থাৎ সামগ্রিক হিসেবে হয়তো ১-২% আমের মধ্যে বালাইনাশকের উপস্থিতি আমাদের জন্য ক্ষতিকর।

এ ধরনের গবেষণাগুলো আমাদের জাতীয়ভাবে খুব বেশি প্রচার পায় না বলেই আমরা যা খুশি বলে দেই। আর এতে সামগ্রিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় আমাদের অর্থনীতি। তাই ঢাকায় একটি ফুড সেফটি ল্যাবরেটরি স্থাপন করে এসব বিষয়ে আরও বেশি প্রচার করা এখন সময়ের দাবি। আশার কথা হলো, পুষ্টিমান ঠিক রেখে খাবার কিভাবে আরও বেশি নিরাপদ রাখা যায়, সে বিষয়ে নেদারল্যান্ডসের সহযােগিতায় একটি প্রকল্প শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় এবং বাংলাদশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ যথাযথভাবে কাজ শুরু করেছে। যা সফলভাবে সম্পন্ন হলে হয়তো আমরা আরও বেশি নিরাপদ খাদ্যের মান নিশ্চিত করতে পারব।

আম পচনশীল ফল। বেশি পাকা অবস্থায় সংগ্রহ করলে সংরক্ষণকাল কম হয়। অধিকাংশ জাতের আম ১৩-১৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাএায় ও ৮৫-৯০% আপেক্ষিক আদ্রতায় বাঁশের ঝুড়ি, বাস্কেট, খড় বিছানো স্থানে ৩-৫ সপ্তাহ সংরক্ষণ করা যায়। গাছ থেকে সাবধানতার সাথে আম পেড়ে আমের আঠা বা কষ ছাড়িয়ে ৫০ ডিগ্রি তাপমাত্রার গরম পানিতে শোধন করে ভালোমতো শুকিয়ে তারপর প্যাকেটজাত করলে এতেও ভালো ফল পাওয়া যায়।

আম পাড়ার পর চুন পানিতে কিছুক্ষণ চুবিয়ে তারপর ভালোমত শুকিয়ে রাখলে আমের স্টেম অ্যান্ড রট নামক রোগ থেকে বাঁচা যায় বলে মত দিয়েছেন কোন কোন গবেষক। এ ছাড়া আম ও লিচু পানিতে ভালো করে ধুয়ে তারপর খেলে স্বাস্থ্যের জন্য তেমন ঝুঁকি থাকে না। বেশি সতর্কতার জন্য লবণ পানিতে ধুয়ে খাওয়া যেতে পারে। যেহেতু চামড়া ছিলে খাওয়া হয়, তাই আমের স্বাস্থ্যঝুঁকি খুবই কম বলে মনে করেন আম নিয়ে কাজ করা বিজ্ঞানীরা।

তাই সবশেষে বলতে চাই, অনলাইন কিংবা কুরিয়ার পরিবহনে আম আনার পর আম পচে গেলে শুধু আমচাষি কিংবা ব্যবসায়ীদের দােষারােপ না করে এর প্রকৃত কারণ উদঘাটন করা জরুরি। বিশ্বে করােনাভাইরাসের কঠিন এ পরিস্থিতির মধ্যেও বর্তমান বাংলাদেশে আমরা সুলভ মূল্যে যে আম পাছি, তার জন্য আম বাগানি ও ব্যবসায়ীদের অবশ্যই ধন্যবাদ জানানো উচিত।

দেশীয় ফল আম নিয়ে কােনো অপপ্রচার নয় বরং জেনে শুনে বুঝে বালাইনাশকের ব্যবহার নিয়ে মানুষকে সচেতন করি ও সহজলভ্য ফলগুলো বেশি বেশি খাওয়ার অভ্যাস গড়ে তুলি। বাজার থেকে আম কিনে পরিপূর্ণ স্বাদ ও পুষ্টি পেতে চাইলে অবশ্যই পরিপক্কের নির্দিষ্ট তারিখের আগে আম খাওয়া ও বিপণন রােধ করি।

 

Leave a Reply